ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গাজা যুদ্ধের অবসান ঘোষণার দুই বছর পরও হত্যা চলছে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2025 ইং
গাজা যুদ্ধের অবসান ঘোষণার দুই বছর পরও হত্যা চলছে ছবির ক্যাপশন: গাজা যুদ্ধের অবসান ঘোষণার দুই বছর পরও হত্যা চলছে
ad728
মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

দু’বছর আগে গাজায় ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটলেও ফিলিস্তিনিদের হত্যা আজও বন্ধ হয়নি। যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণায় বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে স্বস্তির বাতাস বইলেও বাস্তবে গাজায় শান্তির কোনো সুবাতাস নেই। যুদ্ধবিরতির নামে চলছে নির্বিচারে হামলা, গুলিবর্ষণ ও গ্রেফতার অভিযান।

গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে ২০ দফা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া এ চুক্তির পর তাকে শান্তির নায়ক হিসেবে প্রশংসা করা হলেও, যুদ্ধবিরতির বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ইসরাইল আবারও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নতুন হামলা শুরু করেছে।

গাজায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর গত ১১ দিনে অন্তত ৯৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। ইসরাইলের সেনারা বিমান, ট্যাংক, কামান থেকে নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, গাজার নাবলুস, হেবরন ও পূর্ব জেরুজালেম এলাকায় চলছে গণগ্রেফতার অভিযান।

গাজা গণমাধ্যম দপ্তর জানায়, শান্তি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই ৬০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল। স্থানীয়দের ভাষায়, “গাজায় আজও বোমা পড়ছে, মানুষ মরছে, শিশুরা না খেয়ে কাঁদছে—এ কেমন শান্তি!”

চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে দুই পক্ষ। ইসরাইল দাবি করছে, হামাসের যোদ্ধারা প্রথমে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছিল। অপরদিকে হামাসের অভিযোগ—ইসরাইল নতুন করে হামলার অজুহাত খুঁজছে।
গত রবিবার গাজার রাফায় হামাসের যোদ্ধাদের হামলায় দু’জন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়। এর জেরে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা চালায় এবং গাজার জন্য ত্রাণ সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দেয়।

রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র চাপে ইসরাইল শেষ পর্যন্ত ত্রাণ পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নেয়। তবে গাজায় সহিংসতা ও ত্রাণ সংকট এখনো অব্যাহত। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইসরাইল সফর করেছেন যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।

গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা বন্ধ না হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা পুনর্বিবেচনা করছে। ইইউ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন—

“যতক্ষণ না গাজায় বাস্তবিক পরিবর্তন আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার বিষয়টি আলোচনায় থাকবে।”

ইইউ ইতোমধ্যেই ইসরাইলি মন্ত্রীদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে এবং বাণিজ্য সীমিত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে ইসরাইল এখনো মিসরের সঙ্গে রাফা সীমান্ত বন্ধ করে রাখায় গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গাজায় খাবার, পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাজার হাজার মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। গাজায় কৃষকরা তাদের নিজ জমিতে চাষ করতে পারছেন না; ইসরাইলি বাহিনী তাদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

এদিকে, আলজাজিরা জানায়, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে বন্দিদের দেহাবশেষ বিনিময় হলেও রাফা সীমান্ত এখনো বন্ধ। ফলে গাজাবাসীর জীবনযাত্রা আগের মতোই স্থবির। যুদ্ধবিরতির পর থেকে তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত ও উপদেষ্টারা ইসরাইল ও হামাসকে যুদ্ধবিরতি রক্ষায় চাপ দিচ্ছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন,

“যুদ্ধবিরতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে চলছে, তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনও চ্যালেঞ্জ।”

অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গঠিত এই ২০ দফা শান্তি চুক্তি কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল হতে পারে। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—ইসরাইল বহুবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করেছে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে তিনটি বড় বাধা রয়ে গেছে:হামাসের নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্ন, ইসরাইলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত।

এই অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার ধারাবাহিকতায় শান্তি চুক্তির সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফিলিস্তিনে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো এক দূর স্বপ্নই রয়ে গেছে।

গাজার এই বাস্তবতা মানবতার জন্য এক গভীর লজ্জা। যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু হত্যাযজ্ঞ থামেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি সত্যিই মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তবে তাদের উচিত ইসরাইলের আগ্রাসন থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। নয়তো ইতিহাস তাদেরও দায়ী করবে এই নৃশংসতার সহযাত্রী হিসেবে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : মোঃ শাহজাহান বাশার

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী পুনর্বাসিত কমিটি বাতিল চেয়ে সোনালী ব্যাংক

আওয়ামী ফ্যাসিবাদী পুনর্বাসিত কমিটি বাতিল চেয়ে সোনালী ব্যাংক