ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বিতর্ক-আন্দোলন পেরিয়ে জাকসুর ভিপি আসনে আব্দুর রশিদ জিতু

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 14, 2025 ইং
বিতর্ক-আন্দোলন পেরিয়ে জাকসুর ভিপি আসনে আব্দুর রশিদ জিতু ছবির ক্যাপশন: বিতর্ক-আন্দোলন পেরিয়ে জাকসুর ভিপি আসনে আব্দুর রশিদ জিতু
ad728

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেলের প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু তিন হাজার ৩৩৪ ভোট পেয়ে ভিপি পদে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই সাফল্য অর্জন করেছেন।

পুনর্গঠিত রাজনৈতিক পরিধিতে জিতুর বিজয়কে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি আগে ছাত্রলীগ কমিটির সদস্য ছিলেন; কিন্তু গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের রাজনীতি ছেড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সারিতে নামেন এবং সেখানে থেকে দলের বাইরে থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সেই সময়ে তিনি ‘গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’-এর মূল কোর নেতৃত্বেও ছিলেন।

নির্বাচনের আগে জিতু সম্পর্কে বিতর্কও ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “ছাত্রদল, শিবির বা বাগছাসকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তাদের নিজ নিজ দল আছে। কিন্তু জিতুর প্যানেলের আর্থিক ও লজিস্টিক সাপোর্ট কোথা থেকে এসেছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।” ওই মন্তব্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

এ বিষয়ে ভোটের আগের রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিডিও বার্তায় জিতু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “জাকসু নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বিভিন্ন মহল আমাকে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগকে নিয়ে যে ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলেছে, তা আমি তীব্রভাবে নিন্দা করছি। যদি এর কোন প্রমাণ কেউ দিতে পারে, তাহলে আমি যে শাস্তিই দেবেন তা মাথা পেতে নেব।” জিতু আরও বলেন, “আমরা ভয়, ভয়াভীতি ও ভিত্তিহীন অভিযোগের সামনে পরাজিত হইনি।”

নির্বাচনের আগেই জিতুর রাজনৈতিক পথচলায় একাধিক উত্থানপতন ছিল। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। তবে গত বছরের ৩ অক্টোবর ওই আন্দোলনের ১৪ জন সমন্বয়ক ও চার সহসমন্বয়ক পদত্যাগ করেন; তাদের অভিযোগ ছিল—সমন্বয়করা ‘সরকারি দলের মতো আচরণ’ করেছে এবং গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট-বিরুদ্ধ কাজে যুক্ত রয়েছে। সেই তালিকায় জিতুর নামও ছিল। পরে জিতু পদত্যাগের অংশ হিসেবে দাবিতে পাশে থেকেছেন বলে জানা গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গত কয়েক বছরের মধ্যে দ্রুত বদলেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের আগেই ছাত্রলীগ থেকে বিতাড়িত হওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্বভাবিকভাবে উত্তাল হয়ে ওঠে। বিষয়টি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করেছিল—আওয়ামী লীগপন্থি কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তা কোণঠাসা অবস্থায় পড়ে যান। তবে জুলাই আন্দোলনের সময় ওই বিভাজন আরও জটিল রূপ নেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে কিছু পরিবর্তনও লক্ষণীয় ছিল।

নির্বাচনী সময় ছাত্রদল মনোনীত উপ-ভিপি প্রার্থী মো. শেখ সাদী হাসান এক টকশোতে অভিযোগ করেন যে, “ক্যাম্পাসে একটি আলাপ রয়েছে—ঘুমন্ত ছাত্রলীগকে জিতু শেল্টার দিচ্ছেন।” ওই মন্তব্যের সময় জিতু টকশোতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে ভিডিও বার্তায় এসব অভিযোগ অঘোষিত ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন।

জিতুর সমর্থকরা মনে করেন, তাঁর বিজয় একধরনের ‘ছাত্রগত স্বতন্ত্র চয়ন’। তারা বলছেন, জিতু গত কয়েক মাস ধরেই শিক্ষার্থীবর্গের আন্দোলন ও হর্তাকর্তার বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে কথা বলেছেন; সেই কারণে তার প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা জন্মেছে। জাকসুর ফলাফলের বিশ্লেষকরা বলছেন—বহু শিক্ষার্থী এখন দলীয় রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে ‘স্বতন্ত্র, দাবিপূর্ণ ও ভূমিকার ভিত্তিতে’ নেতৃত্ব পছন্দ করছে।

অপরদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল ও তাদের সমর্থকরা নির্বাচনী পরিবেশ ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা দাবি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণভাবে নির্বাচনী যন্ত্রণা ও বহিরাগত প্রভাবের ছায়া রয়েছে—যা ভবিষ্যতে আরও তদন্তের দাবী তুলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নিরীক্ষণকারী সংস্থার কোন নির্দিষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

জিতু নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও গতিবিধি সম্পর্কে পরিষ্কার করে বলেছেন—তিনি এখন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’-এর পক্ষ থেকে কাজ করবেন এবং ছাত্রসংসদের ভিপি হিসেবে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যার সমাধান ও আওয়ামী, বিরোধী সব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষা করবেন।

নির্বাচনী এই ফলাফল জাহাঙ্গীরনগরের চলমান রাজনৈতিক ক্ষুদ্রাচরণ ও ছাত্রসংগঠনের পরিবর্তনশীল চিত্রকে আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। আগামী দিনে জিতু ও তার প্যানেল কীভাবে প্রশাসন ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় বা দ্বন্দ্ব গড়বে—সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : মোঃ শাহজাহান বাশার

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদে তিতাস গ্যাসের অভিযান: সংযোগ বিচ্ছিন

অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদে তিতাস গ্যাসের অভিযান: সংযোগ বিচ্ছিন