
পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ
জয়পুরহটের পাঁচবিবিতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউনিয়নের মানুষগুলোর আদালতে না গিয়ে গ্রাম আদালতের উপর রাস্তা রাখছে। মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকা ফি জমা দিয়ে ন্যায় বিচার পাওয়ায় বেশ খুশি বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষ। বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে দায়ের করা ১৯৭'টি মামলার মধ্যে ১৭২'টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং জেলার ৩২'টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে পিছনে ফেলে প্রথমস্থানের অধিকার লাভ করেন পাঁচবিবির বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নাজমুল হক।
ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সীমান্তবর্তী চকশিমুলীয়া গ্রামের দিনমজুর ইউনুেছ আলী মন্ডল জামাইয়ের বিরুদ্ধে বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করেন। ওই দিনমজুর গ্রাম আদালতে অভিযোগ করে বলেন, আমার মেয়ের বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আমার জামাই ও তার পরিবারের সবাই মিলে আমার মেয়েকে নানা ভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন করে আসছিল। আমার মেয়ের সংসার টিকানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেও কোন কাজ হয়নি। তাই আমি গ্রাম আদালতে আশ্রয় নেই।
উপজেলার চকশিমুলীয়া গ্রামের দিনমজুর ইউনুছ আলী মন্ডল বলেন, আমি গরীব মানুষ আমার কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে আত্বীয় স্বজন নিয়ে ধুমধাম করে একমাত্র আদরের স্কুল পড়–য়াা মেয়ের বিয়ে দেই। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আমার জামাই ও তার পরিবারের সবাই মিলে আমার মেয়েকে নানা ভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন করে আসছিলেন। বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার মেয়ে একটি প্রতিবন্ধী সন্তান হয়। আমি অনেক চিন্তা করি যে আদালতে গেলে অনেক টাকা খরচ হবে এবং বছরের পর বছর আদালত চত্বরে ঘুরতে হতো। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নিবার্হী অফিসারকে জানালে তিনি গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করতে বলেন। তাই নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে উচ্চ আদালতে না গিয়ে ১০ টাকা ফি জমা দিয়ে বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে অভিযোগ দায়ের করি। অভিযোগ দায়ের একদিন পরেই সমাধান পাই। একদিনে সমাধান পাওয়ায় আমি অনেক খুশি হয়েছি।
উপজেলার ১ নং বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গ্রাম আদালতের বিচারক নাজমুল হক বলেন, গ্রাম আদালতে বাদি বিবাদী, উকিল ও পেশকারের সমন্বয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গ্রাম আদালতে সরকারি বিধি অনুযায়ী ৩ লাখ টাকার বিচার কার্যক্রম করতে পারি। ৩ লাখ টাকার বিচার কার্যক্রমে চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা মিলে গ্রাম আদালতেই মিটিয়ে দেই। এছাড়াও ১০ টাকা ফি জমা দিয়ে ছোটখাটো সমস্যার সমাধান পেয়ে বাদী বিবাদী উভয় পক্ষেই খুশি হন। বাগজানা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে দায়ের করা ১৯৭'টি মামলার মধ্যে ১৭২'টি নিষ্পত্তি হওয়ায় জেলার মধ্যে আমরা প্রথমস্থান অধিকার করেছি।
বালিঘাটা ইউনিয়নের একজন বিচার প্রাথী বলেন, আমার জমিজমা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। আমি ২০ টাকা ফি দিয়ে গ্রাম আদালতে অভিযোগ দেয়। পরবর্তীতে গ্রাম আদালত বসিয়ে উভয়পক্ষকে বুঝিয়ে সমস্যার সমাধাণ করে দেন গ্রাম আদালতের বিচারক।
বালিঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ রাশেদুল বলেন, আমি গ্রাম আদালতের দায়িত্ব পাওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে ৪১ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্য ৩১ টি মামলা নিষ্পতি করা হয়েছে। গ্রাম আদালতে কেউ মামলা দায়ের করলে তা দ্রুত সমাধান করে দেওয়া হয়। আমি প্রায় দুই মাসে ৩১ টি মামলা নিষ্পতি করেছি। আশা করছি আগামীতে জেলার মধ্য প্রথমস্থানের অধিকার লাভ করবো।
আটাপুর ইউনিয়নের একজন নারী স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেয়ে ওই নারী গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে গ্রাম আদালত বসিয়ে একদিনেই সমস্যার সমাধান করে দেন গ্রাম আদালতের বিচারক।
আটাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গ্রাম আদালতের বিচারক আ,স,ম সামছুল আরেফিন চৌধুরী আবু বলেন, গ্রাম আদালতে বাদি বিবাদী, উকিল ও পেশকারের সমন্বয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আমার ইউনিয়নে ২০২৪ সালের জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রাম আদালতে ৬২ টি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্য ৬২টি মামলায় গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত ৩৯ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্য ৩৯ টি মামলায় গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
গ্রাম আদালতের ডিস্ট্রিক ম্যানেজার মোঃ রাজিউর রহমান রাজু জানান, গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রমগুলো নিয়মিত মনিটরিং করে থাকি। বর্তমানে গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউনিয়নের মানুষগুলোর আদালতে না গিয়ে গ্রাম আদালতের উপর রাস্তা রাখছে।
পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা রিয়াজ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করছি। উপজেলার ৮ টি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে মোট ৮২৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে ৭৯২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে বিচারসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতেই সরকার এই ব্যবস্থা চালু করেছে।
চলিত বছরের (১৯ আগষ্ট) জয়পুরহাট জেলা প্রশাসকের কনফারেন্স রুমে ইউনিয়ন পরিষদের পরিচালিত গ্রাম আদালত পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে প্রথম স্থান অর্জনকারীর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার চৌধুরী।