ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অর্থবছরের শুরুতেই ব্যয়ের ঝড়: ইতিহাসের সর্বোচ্চ সরকারি খরচ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 8, 2025 ইং
অর্থবছরের শুরুতেই ব্যয়ের ঝড়: ইতিহাসের সর্বোচ্চ সরকারি খরচ ছবির ক্যাপশন: অর্থবছরের শুরুতেই ব্যয়ের ঝড়: ইতিহাসের সর্বোচ্চ সরকারি খরচ
ad728

মো. শাহজাহান বাশার

অর্থনৈতিক মিতব্যয়িতা, ভর্তুকি কমানো ও ব্যয়ের যুক্তিকরণে জোর দেওয়ার ঘোষণার মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যয়ের গতি যেন বিপরীত স্রোতে বইছে। সদ্যসমাপ্ত জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদে (২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক) সরকারের ব্যয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব বলছে— পরিচালন ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে তিন মাসে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, যা দেশের বাজেট বাস্তবায়নের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ব্যয় ৯৪ হাজার ৩৯৯ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ব্যয় ১০ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা।

প্রথাগতভাবে বাজেট ঘোষণার পর প্রথম প্রান্তিকটি সবসময় ব্যয়ের দিক থেকে মন্থর থাকে। নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ ছাড়ের বিলম্বে এই সময়ে ব্যয় সাধারণত তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু চলতি অর্থবছর যেন সেই ধারা ভেঙে দিয়েছে।

গত অর্থবছরের একই সময়ে মোট ব্যয় ছিল ৯৫ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। তারও আগের বছরে ছিল ৮৪ হাজার কোটি টাকার নিচে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে প্রথম প্রান্তিকের সরকারি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থিতি ফিরলেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিচালন খাতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।

পরিচালন খাতে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি গেছে কৃষি ও খাদ্য খাতে। কৃষি মন্ত্রণালয় মাত্র তিন মাসে ব্যয় করেছে ৭ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা বেশি।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, খাদ্য মজুদ পুনর্গঠন, গুদাম সংস্কার এবং দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কারণে এ ব্যয় বেড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে ব্যয়ের মাত্রা বেশি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) ব্যয়ও আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। চলতি বছর এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই ব্যয় মূলত বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও অনুদান খরচের সঙ্গে যুক্ত।

এক অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন—“অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যয়ের এই গতি ভবিষ্যৎ রাজস্ব পরিকল্পনার ওপর বড় চাপ তৈরি করবে। ব্যয় বৃদ্ধি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি ও ঘাটতি উভয়ই বাড়বে।”

সরকারি ব্যয়ের এই প্রবণতা একদিকে যেমন অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এমন প্রবাহ ঘাটতি বাড়াতে পারে। বর্তমানে রাজস্ব আদায়ও প্রত্যাশার তুলনায় ধীর গতিতে চলছে।

একজন সাবেক অর্থসচিবের ভাষায়,“চলমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময়ে আর্থিক শৃঙ্খলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যয়ের গতি যদি নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে আগামী বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়বে।”

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করা। কৃষি ও খাদ্য খাতে বরাদ্দের যৌক্তিকতা এবং প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের নিরীক্ষা জরুরি হয়ে পড়েছে।

তাদের পরামর্শ, অন্তর্বর্তী সরকার যদি স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে, তবে ব্যয়ের এই উল্লম্ফন ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিতও বয়ে আনতে পারে।

অর্থনীতির গতি ও সরকারের দায়িত্বশীলতা একে অপরের পরিপূরক। উন্নয়ন ও জনকল্যাণের নামে ব্যয়ের লাগাম ছেড়ে দিলে সেটি অদূর ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজস্ব ঘাটতির রূপ নিতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ব্যয়ের গতি নয়, গুণগত মানে জোর দেওয়া— যাতে প্রতিটি ব্যয় নাগরিক কল্যাণে বাস্তব সুফল আনে।
সূত্র : বিবিসি নিউজ বাংলা 


নিউজটি পোস্ট করেছেন : মোঃ শাহজাহান বাশার

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
তারেক রহমান দেশে ফিরে ঘোষণা করবেন প্রার্থী তালিকা

তারেক রহমান দেশে ফিরে ঘোষণা করবেন প্রার্থী তালিকা