কাজী জিহাদ, জাজিরা (শরীয়তপুর) প্রতিনিধি :
বাংলাদেশে একজন শিশুর জন্মের পর নাগরিক হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি হলো জন্ম সনদ। এই সনদ শুধু একটি কাগজ নয়, এটি তার নাগরিক পরিচয়, শিক্ষাজীবন, কর্মসংস্থান এমনকি ভবিষ্যতে স্বপ্নপূরণের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ নথিটি যখন ভুয়া তথ্য আর জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি হয়, তখন রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডারের উপর মানুষের আস্থা উঠে যায়।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সেনেরচর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবু ছাইমের বিরুদ্ধে ঠিক এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি ভুয়া কাগজপত্র ও তথ্যের ভিত্তিতে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করেন।
জানা যায়, সচিব আবু ছাইম পরিচিত দালালের মাধ্যমে কিছু পরিবার ও ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নিয়ে জন্মসনদ তৈরি করে দেন। এতে সঠিক বয়স বা প্রকৃত পরিচয় গোপন করে নতুনভাবে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়। ফলে প্রকৃত সনদ প্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। আর সরকারি নথি জালিয়াতির কারণে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
ভোটার তালিকা, পাসপোর্ট, স্কুল-কলেজে ভর্তি, চাকরি বা বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে এসব জাল নথি ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে। প্রকৃত জন্মনিবন্ধন করতে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়।
অথচ যারা টাকা দেয়, তাদের জন্মসনদ মিনিটের মধ্যে করে দেওয়া হয়। স্থানীয় একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের বাচ্চাদের জন্মসনদ করতে ঘুরতে হয় সপ্তাহের পর সপ্তাহ। কিন্তু যারা টাকা দেয়, তাদের বয়সও বদলে যায়, আবার মিথ্যা তথ্যেও সনদ পাওয়া যায়।”
অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, গত ২৬ আগস্ট সেনেরচর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রাজ্জাক ছৈয়াল নামে এক ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়। ওই জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করতে নিবন্ধন করতে আসা ব্যক্তিকে যাচাইয়ের জন্য শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত থাকার প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করা হয়। যা জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আইনবহির্ভুত।
তবে, খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্রটি এডিট করে তৈরী করা হয়েছে।
১০৮ নং সেনেরচর দক্ষিণ আফাজদ্দিন মুন্সি কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা প্রত্যয়নপত্রটি দেখে বলেন, ‘ওই প্রত্যয়নপত্র তার প্রতিষ্ঠানের নয়। এমন কোন প্রত্যয়ন কখনো কাউকে দেয়া হয়নি। এমনকি রাজ্জাক ছৈয়াল নামে কোন ব্যক্তি ওই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেননি।’
অন্যদিকে দেখা যায়, মো: নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি নেত্রকোনার কালমাকান্দার নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন গত ২৮ আগস্ট ২০২৪ সালে।
অথচ ওই জন্মনিবন্ধনটির উপরের অংশে সেনেরচর ইউনিয়নের তথ্য এডিট করে বসানো হয়েছে এবং গত ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে সেনেরচর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবু ছাইম ও চেয়ারম্যানের সিল ও স্বাক্ষরসহ অফিসিয়াল সিল সংযুক্ত করা হয়েছে।
ইউপি সচিব আবু ছাইমের বিরুদ্ধে এমন বেশ কয়েকটি অনিয়মের আলামত পাওয়া গিয়েছে। ওই ইউনিয়নের একাধিক সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, সচিব টাকার বিনিময়ে বিভিন্নজনকে জন্মনিবন্ধন করে দেন।
বিশেষ করে, জন্ম তারিখ পরিবর্তন করে বয়স বাড়ানো ও কমানোর বিষয়ে মোটা অংকের টাকা নিয়ে কাজ করে দেন। এছাড়াও সাধারণ মানুষ জন্মনিবন্ধন করতে গেলে তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত হয়রানি করেন এবং জন্মনিবন্ধন সঠিকভাবে সম্পন্ন করে দেন না।
অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে, ইউপি সচিব আবু সাইম বলেন, ‘‘আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে।’’ রাজ্জাক ছৈয়াল নামে জন্মনিবন্ধনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাচাই করা হয়নি, এখন যাচাই করে দেখব।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান জালাল জমাদ্দার বলেন, ‘‘এবিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। এবিষয়ে সচিবদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তারাই ভালো বলতে পারবে।’’
এবিষয়ে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাবেরী রায় বলেন, ‘‘বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’
উপ-পরিচালক স্থানীয় সরকার বিভাগ, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন মো.ওয়াহিদ হোসেন বলেন,"বিষয়টি আমি আপনাদের কাছেই শুনলাম তদন্ত করে প্রমাণ মিললে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
মোঃ মনিরুজ্জামান